Wednesday, May 11, 2016

ছবিব্লগঃ প্রিয় রাজশাহী!!

মূল লেখার লিংক

রাজশাহীর পদ্মা


প্রিয় রাজশাহী,
আশা করি ভালো আছো। আমিও ভালো আছি। মানে যতটুকু ভালো না থাকলেই নয় ঠিক ততটুকু। বিজয় দিবস এলো গেলো। গত চার বছর হল বিদেশে আছি। তোমাকে এবারও বিজয় দিবসে খুব মিস করলাম। তুমি ফুলে ফুলে ভরে গেছ, এইটা দেখাটাই কোন একসময় আমাদের একটা প্রধান কাজ ছিল, তুমি তো জানোই। বিদেশে আসার আগ অব্ধি প্রত্যেক বছর এদিনে তোমার শহীদ মিনারগুলিতে জনসমাগম একটু একটু করে বাড়তে দেখেছি। এবারও নিশ্চয়ই বেড়েছে এমন। যেভাবে ফেসবুক জুড়ে তোমার ছবি দেখলাম, তাতে গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে। কুসুম ভোরে এখনও তোমার শহীদ মিনারের আঙিনা ছোট্ট শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে থাকে, তার কোন বাত্যয় নিশ্চয়ই এবারও হয়নি। বিজয় দিবসের আগে একে একে অনেকগুলি দুঃসংবাদ শুনে মনটা খুব খারাপ হয়েছিল। জানোই তো, রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহায় সম্বলহীন করা হয়েছে, তাজিন গার্মেন্টস এ কতগুলো মানুষ পুড়ে কয়লা হয়ে গেল, বিশ্বজিতের মৃত্যু দেখে তো বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছি আমরা সবাই! এসবের উত্তাপ কি তুমি টের পেয়েছিলে? পাও? তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা তো আজীবন প্রতিবাদী, তোমার সাহেব বাজারের মোড় তো সংগ্রামী কণ্ঠে কাঁপা, এবার কি তার ব্যাতিক্রম হয়েছে? আমি জানি হয়নি। জোহা স্যার শিক্ষার্থীদের প্রান বাঁচাতে গিয়ে তোমারই রাস্তায় শহীদ হয়েছিলেন, তাঁর উত্তরসূরিদের ওপর তুমি নিশ্চয়ই আস্থা রাখতে পার।
আচ্ছা, সারা দেশে কুখ্যাত রাজাকারদের বিচার চলছে, এনিয়ে জামাত শিবির গ্যাং নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। তোমার ওখানে কি অবস্থা? যত যাই বলি তুমি কিন্তু বরাবরই শিবিরের প্রতি বেশ দুর্বলতা দেখিয়ে এসেছ, বাংলা ভাই কিন্তু তোমারই এলাকায় লালিত হয়েছিল। এখনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চার ধারে শিবির তার আস্তানা জমিয়ে বসেছে বলে শুনি। এই বিদেশে এসে তোমার শহরের বাসিন্দা বলে পরিচয় দিলে মানুষ নানান কূটকথা বলে, বলে আমি নাকি বাংলা ভাইয়ের এলাকার মানুষ! আমার এত খারাপ লাগে, তোমার লাগেনা? তোমার লজ্জা করেনা? তোমারই বুকের ওপর বাংলা ভাই মিছিল করে, শিবিরের কর্মী আমার প্রতিবাদী ভাইয়ের রগ কেটে দেয়, আমার শিক্ষক চাচাকে খুন করে ম্যানহোলে ফেলে রাখে- এসব দেখেশুনে তোমার রাগ হয়না? তুমি কষ্ট পাওনা? তুমিইনা বীর শহীদের যুদ্ধক্ষেত্র? তোমার মাটিতে না পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র যুদ্ধ হয়েছিলো? তোমার সেই সব সূর্য সন্তানদের উত্তরাধিকারেরা আজ কোথায়? তাঁরা না জাগলে সকাল হবে কি করে প্রিয় রাজশাহী?
তোমার পদ্মা ধীরে ধীরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, তোমার বাঁধের ওপর দাঁড়ালে বিশাল আকারের বিশ্রী একটা চর দেখা যায়, একি সহ্য করার মতন,বলো? আমাদের শৈশবের কৈশোরের সেই উত্তাল পদ্মা কোন এক অচেনা চরের মাঝে হারিয়ে গেল! সেই চরে এখন চাষাবাদ হয়, সেই চরে এখন বসতি হয়েছে। কিন্তু আমার মন কেন এমন করে, কেন ওই চরকে অভিসম্পাত দিয়ে বসি? টি-বাঁধের কাছে যে নৌকো নিয়ে একসময় নদী বক্ষে ঘুরে বেরাতাম,সেই নদীর গতিপথ কত ছোট হয়েছে এখন! আমার সাত বছরের কন্যাকে আমি এ কোন পদ্মা দেখালাম সেদিন! ও বলছিল, “বাবা, কত ছোট এই পদ্মা!” ওর কি দোষ বলো? ও যে গোয়ালন্দের মোহনার পদ্মা দেখে এসেছে! আমি যে ওকে বলতে পারলামনা যে আমাদের পদ্মা গোয়ালন্দের চাইতেও বড় ছিল! ছিল প্রলয়ংকারি, ছিল ভয়ংকর সুন্দর! তোমার বাঁধের কাছে দেখলাম বসার নতুন জায়গা হয়েছে, সৌন্দর্য বর্ধনকারী কিছু স্থাপনাও দেখে এলাম এইবার। তোমার শহরবাসীরা বেশ উপভোগ করছে ওখানে, আমার মেয়ে তো বেশ নাচানাচি শুরু করে দিয়েছিল। আমি শুধু পদ্মার করুণ রাগ দেখে যাচ্ছিলাম!
তোমার শহরে দেখলাম নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে, মানে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে ব্যাপক। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে দেশ, তুমিই বা বাতিল হবে কেন? একটা সংযোগ সড়ক দেখে এলাম, ওটা নাকি অলকার মোড় থেকে সাহেব বাজারে গিয়ে মিলবে! শুনেছি অনেক পুরনো ঘরবাড়ি নাকি কাটা পড়বে? আমি তো নিজের চোখেই দেখে এলাম যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘরবাড়ি ইতিমধ্যে ভাঙ্গা পড়েছে। আচ্ছা, ইউরোপের অনেক শহরের কেন্দ্রে দেখি পুরণো স্থাপনার কিছুই ভাঙ্গা হয়না, বরং পুরণো হলে সেগুলোকে মেরামত করে তাঁর অতীত চেহারার নবায়ন করা হয়। এইযে আমিই যে শহরে রয়েছি, ইতালির বোলোনিয়ায়, এখানে কিন্তু নগর কেন্দ্রে নতুন কোন স্থাপনা নির্মাণ আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কবে যে তোমার শহরেও এমন আইন দেখব! এইযে তোমার বুকেই অতীতকে তামা তামা করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠেনা কেন? কেন রাস্তায় মিটিং মিছিল হয়না? তোমার শহরে এত জায়গা খালি পড়ে আছে! মানুষ নতুন আবাস সেখানে গড়ে তুলে নগর কেন্দ্রকে কেন একটু রেহাই দেয়না? শুনলাম ঢপকল গুলোরও নাকি যেনতেন অবস্থা! এই ঢপকলগুলো তোমার ঐতিহাসিক সম্পদ, সেগুলোও কি চলে যাবে বেনিয়াদের খপ্পরে? আর তুমি কি চেয়ে চেয়ে দেখবে নীরব সাক্ষী হয়ে?
রাজশাহী, তোমাকে নিয়ে আমার অনেক দুশ্চিন্তা হয়, কিন্তু আনন্দও কিছু কম হয়না। তুমি যে দিনে দিনে কত জনপ্রিয় হয়ে উঠছ, জানো কি? তোমার পুঠিয়া দেখতে দূর দুরান্ত থেকে কত মানুষ আসে, একবার দেখেও তাঁদের মনের আঁশ মেটেনা, বারবার আসে। আমার ইতালিয়ান প্রফেসর তো পুঠিয়া দেখে মুগ্ধ, বিহ্বল হয়ে আছেন। আমাকে বলেছেন, বেঁচে থাকতে থাকতে আরেকবার ওখানে যেতে চান। কিসমত মারিয়া মসজিদকে ঘিরে মানুষের ব্যাপক কৌতূহল জেগেছে। আমি তো এইবার তোমার তাহেরপুর জমিদারবাড়ি দেখে আহ্লাদে আটখানা। চারঘাট স্লুইস গেটের কাছেও অনেক জনসমাগম দেখে এলাম, যদিও জলের দেখা পেলামনা, শীতকাল বলেই কিনা! তোমার বাঘা মসজিদ নিয়েও কিন্তু মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ আছে আর তা উত্তরোত্তর বাড়ছেই।
তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হয়ে গেল, ক’দিন আগেই। শুনলাম ছোটখাটো কিছু ভুলত্রুটি ছাড়া অংশগ্রহণকারীরা নাকি বেজায় আনন্দ করেছেন। ফেসবুকে সেইসব ছবি দেখে মনের অজান্তেই কান্না চলে এল। আনন্দের কান্না। জানোই তো, তোমার মতিহারের সবুজ চত্বরে ২৮টি বসন্ত কাটিয়ে এসেছি। মতিহারকে ভোলা কার সাধ্যি! যাই হোক, সমাবর্তনে সবাইকে আনুষ্ঠানিক পোষাকে অসাধারণ লাগছিল! অনেকে দেখলাম পুরো পরিবার নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন। আর আমাকে দেখো, এই ছাতার মাথা বিদেশে পড়ে রয়েছি, অযথা!
শোনো, অনেক লিখে ফেললাম। এটাই তোমাকে লেখা আমার প্রথম চিঠি। অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এরই মাঝে তোমার মনোযোগ হারিয়ে গেলে আবার আমাকে দোষারোপ কোরোনা যেন! আমি জানি তুমি আমার চিঠির সাড়া দেবেনা, তবে আমি আবার লিখব, অনেক লিখব, তুমি কিন্তু না বলতে পারবেনা! ভাল থেকো রাজশাহী। আমার এই শুকনো চোখে তুমি আলো হয়ে বিরাজ কোরো। তোমার হৃদয় থেকে সকল ধর্মান্ধতা, সকল কূপমুন্ডুকতা দূর হোক।
পুনশ্চঃ গত কয়েক বছরে তোমার কিছু ছবি তুলেছি, এখানে যুক্ত করে দিলাম। তোমার ভালো লাগলে খুশী হবো।

ক) শহীদ মিনার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

IMG_0401

খ) বধ্যভূমি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SD

গ) সাবাস বাংলাদেশ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sa

ঘ) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

c13

ঙ) বধ্যভূমি রাঃ বিঃ-র পেছনে বিলের ভেতর ফুটে থাকা শাপলা ফুল

bgd (1)
 
চ) হনুমান মন্দিরের ভগ্নাংশ, সাহেব বাজার, রাজশাহী

DSC_0325

ছ) কুসুম্বা মসজিদের ভেতরে বিশ্রাম

DSC_0414

জ) দোলমঞ্চ, পুঠিয়া

DSC_0775

ঝ) তাহেরপুর জমিদারবাড়ির সম্মুখভাগ

IMG_0702

ঞ) দুর্গাপুরের প্রকৃতি অপার

IMG_0695

ট) মাষকাটাদীঘির একাংশ

DSC_1016

ঠ) বিহাসে ফুটে থাকা রক্তজবা

DSC_0019

ঠ) রাজশাহী ধান গবেষণা ইন্সিটিউট

c1

ড) চায়ের ঠেকে গরম চা, কুসুম্বা মসজিদ

c12

ঢ) সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো শাহ্‌ মখদুম মাজারে

c19

ণ) সন্ধ্যাবেলার সোনাদিঘির মোড়

c25
 
ত) গাছের গায়ে আঠা, আঠার ভেতর প্রতিবিম্ব

DSC_0718

থ) হারমোনিয়াম, তবলাবাঁয়া, রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ

s2

দ) উপশহর, রাজশাহীতে সবুজের কেনা বেচা

DSC_0885

ধ) “আগুন দেখেছি আমি কত জানালায়”- হেতম খাঁ, রাজশাহী

c11

ন) ভোরের আলোয় দুধ ওয়ালার ঘটি ভরা সাইকেল

c5

প) বিহাসে আমার কন্যার দৌড়

DSC_0714

ফ) পুনশ্চ পদ্মা

DSC_0546

ব) ঐতিহাসিক ঢপকল

c8

ভ) চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে- বিহাস, রাজশাহী

s5

ম) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও ফটক (প্রায় ৮০০ একর জায়গা) 

আবাসিক হল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


ন) বিহাস স্পেশাল








c6
Previous Post
Next Post

0 comments: Post Yours! Read Comment Policy ▼
লক্ষ্য করুনঃ
পোষ্টের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন কোন কমেন্ট করা যাবে না। কোন কারণ ব্যতীত আপনার ব্লগের লিংক শেয়ার করতে যাবেন না। সবসময় গঠনমূলক মন্তব্য প্রদানের চেষ্টা করবেন। আমরা সবার মতামত সমানভাবে মূল্যায়ন করি এবং যথাসময়ে প্রতি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি।

Post a Comment

 
Copyright © বিডি.পয়সা ক্লিক,নিবন্ধিত ও সংরক্ষিত. মডিফাইঃ পিসি টীম, সার্ভার হোস্টেডঃ গুগল সার্ভিস